সংবাদ শিরোনাম:
দোয়ারাবাজারে ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার ১৫ আগস্ট উপলক্ষে বিরামপুরে বিএনপির দোয়া ও আলোচনা সভার প্রস্তুতি সেলাই মেশিনে বদলে যাচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের আদিবাসী নারী সিমা মিনজির জীবন মির্জা রুহুল আমিন স্মৃতি গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন ঠাকুরগাঁও সীমান্তে ফেন্সিডিলসহ যুবক আটক বড়পুকুরিয়া কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ নং ইউনিটের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ফুলবাড়ীতে জমি দখলের অভিযোগ, দায়ের করা মামলা এবং ইমরান চৌধুরী নিশাদ গংয়ের মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত সংবাদ সম্মেলনের প্রতিবাদ পৌর চেয়ারম্যান থেকে বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আদিবাসী পরিচয় নিয়ে বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ ৮০ হাঁস থেকে ৭৫০ হাঁস পালনে ভাগ্য বদল হামিদ মিয়ার
আদিবাসী পরিচয় নিয়ে বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ

আদিবাসী পরিচয় নিয়ে বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ

শান্ত পাহান ঠাকুরগাঁও জেলা থেকে:

বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের পরিচয়, ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও অধিকার নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়া কয়েকটি বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের লেখক ও রাণীশংকৈল উপজেলা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সহ-সভাপতি শান্ত পাহান। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের ঐতিহাসিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই।” অন্যদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক।” এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের অধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এসব বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে শান্ত পাহান বলেন, “আমাদের নিজেদের ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রয়েছে। আমাদের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয়। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে আসছি। তাই আমাদের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার বা প্রশ্নবিদ্ধ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
তিনি বলেন, “আমরা মানছি যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আমাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়নি। রাষ্ট্রীয় নথিতে আমাদের অনেককে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি কোনো একটি পরিভাষা দিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের জাতিগত পরিচয়, ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা যায় না।”
শান্ত পাহান আরও বলেন, বাংলাদেশের সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁওসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছেন এবং দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং জাতিগত পরিচয় এক বিষয় নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক এবং নিজস্ব জাতিসত্তার পরিচয় বহন করতে পারেন। নাগরিকত্বের জায়গায় আমরা সবাই সমান, কিন্তু জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জায়গায় প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য রয়েছে।”
কোনো জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় নিয়ে মন্তব্য করার আগে সেই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে যথাযথভাবে জানা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন শান্ত পাহান। তিনি দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে আরও সংবেদনশীল, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রত্যাশা করেন।
তিনি আরও বলেন, জাতিগত পরিচয় নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে সেই মতপার্থক্য যেন কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষের মর্যাদা, অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে খাটো করার কারণ না হয়। এ বিষয়ে সরকার, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে জানিয়ে শান্ত পাহান বলেন, “আমরা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। একই সঙ্গে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জাতিগত পরিচয়ের মর্যাদাও চাই। সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জাতিগত পরিচয়ের মর্যাদার কোনো বিরোধ নেই।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৈচিত্র্যই দেশের অন্যতম শক্তি। বিভিন্ন জাতিসত্তার ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারাকে সম্মান ও সংরক্ষণ করা হলে জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে। পরিচয় নিয়ে বিভাজন সৃষ্টি না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
শান্ত পাহান আরও বলেন, কোনো জাতিসত্তার পরিচয়কে অস্বীকার বা প্রশ্নবিদ্ধ করে বক্তব্য না দিয়ে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষের মতামত ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, ভাষা, সংস্কৃতি ও বাস্তবতার আলোকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন।
সবশেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পুনর্বিবেচনা করে দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের অনুভূতি, মর্যাদা ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান শান্ত পাহান।
তিনি বলেন, “কোনো জাতিসত্তার পরিচয় অস্বীকার নয়—বরং বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে সম্মান করেই সমঅধিকার, মর্যাদা ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। আমরা রাষ্ট্রের অংশ, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক; একই সঙ্গে আমরা আমাদের নিজস্ব জাতিসত্তার মানুষ। এই দুই পরিচয় পাশাপাশি বহন করাই আমাদের বাস্তবতা।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের প্রতিটি জাতিসত্তার মানুষের আত্মপরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা রাষ্ট্র ও সমাজের সবার দায়িত্ব। কোনো জনগোষ্ঠীকে অবজ্ঞা বা হেয় না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।”
শান্ত পাহান বলেন, “আমরা চাই না জাতিগত পরিচয় নিয়ে কোনো ধরনের বিভাজন বা উত্তেজনা সৃষ্টি হোক। আমরা চাই যুক্তি, ইতিহাস, গবেষণা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে এ বিষয়ে আলোচনা হোক। সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষের বক্তব্য ও অভিজ্ঞতাকেও সেই আলোচনায় যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং দেশের সব জাতিসত্তার মানুষের মর্যাদা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে ভাগ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি

Design & Development BY : ThemeNeed.com